বিশেষ প্রতিনিধি
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ অনুবিভাগের শাখা-৫-এর একজন সাধারণ তৃতীয় শ্রেণীর অফিস সহকারী মিজানুর রহমান ওরফে মিজান, যাঁর সাধারণ অবয়বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বিশাল অবৈধ বিত্ত-বৈভবের পাহাড়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভূমি অধিগ্রহণের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর শাখায় দায়িত্ব পালনের সুযোগে মিজান একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন এবং ঘুষ, দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান ও চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকায় মিজানের নামে-বেনামে একাধিক বিলাসবহুল সুউচ্চ আবাসিক ভবন থাকার তথ্য উঠে এসেছে অনুসন্ধানে, যা একজন সামান্য সরকারি কর্মচারীর বেতন দিয়ে কোনোভাবেই অর্জন সম্ভব নয়। তাঁর মালিকানাধীন ভবনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১০ তলা বিশিষ্ট ‘কলেজ পার্ক’, যেখানে তিনি নিজে সপরিবারে কোটি টাকা ব্যয়ে সজ্জিত রাজকীয় একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করেন এবং যার বর্তমান বাজারমূল্য দুই কোটি টাকারও বেশি। এছাড়াও তাঁর মালিকানায় রয়েছে ১০ তলা ‘আদর্শ নিবাস’, ১২ তলা ‘ঢাকা উদ্যান সিটি সেন্টার’ এবং চন্দ্রিমা মডেল টাউনে ‘এভিনিউ পার্ক’, ‘মাধবীলতা’ ও ‘প্রত্যাশা প্যালেস’-সহ একাধিক বিলাসবহুল ভবন। বর্তমানেও তাঁর বেশ কিছু ভবনের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে একটি ভবনের নিচতলার ১২টি দোকান থেকেই তিনি প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ভাড়া আদায় করেন। মিজান অত্যন্ত চতুরতার সাথে তাঁর এই অবৈধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করেন; প্রথমে নিজে জমি কেনেন ও নির্মাণ শুরু করেন, কিন্তু পরবর্তীতে আইনি জটিলতা ও অর্থের উৎস আড়াল করতে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ‘শেয়ার’ বিক্রি করে শেয়ারহোল্ডারদের নামেই ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি করান।
মিজানের সাথে কাজ করা শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর অন্তত ৮-৯টি বাড়ি রয়েছে এবং সেগুলোতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও উন্নত মানের সামগ্রী ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। এই বিস্ময়কর উত্থানের পেছনে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক যোগসূত্রের তথ্য মিলেছে; মিজান ভোলা-২ আসনের সাবেক বিতর্কিত এমপি আলী আজম মুকুলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাবেক এমপি মুকুলের অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ মিজানের কাছে গচ্ছিত রাখা হতো এবং সেই টাকা সাদা করতেই আবাসন খাতে এমন বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে। মূলত এমপির রাজনৈতিক আশ্রয় ও ক্ষমতার দাপটেই মিজান ডিসি অফিসে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে এই শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন, যা নিয়ে খোদ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
এই বিষয়ে জানতে চেয়ে মিজানুর রহমানের মোবাইলে কল করা হলে তিনি জানান, ” তার বিরুদ্ধে আনা এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট “। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে থাকা অত্যন্ত চতুর মিজান মূলত দুর্নীতির গড ফাদার।
ডিসি অফিসের ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন বা ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় পিয়নের কাজ করা মিজান মূলত- যাদের জমি সরকারীভাবে অধিগ্রহণ করা হয়, তাদের থেকে চেক ইস্যু কিংবা টাকা ছাড়, রেকর্ড হালনাগাদ, ক্ষতি পুরণ প্রদান, মূল্যায়ন- ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এগুলো থেকেই সিন্ডিকেট করে অর্থ আদায় করে নেন।
এলএ শাখার তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী মিজানুর রহমানের দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চেয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মোঃ শামীম হুসাইনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ মারফত তারা জেনেছেন। এ বিষয়ে তারা তদন্ত করবেন”।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মিজানের নামে-বেনামে থাকা সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করা উচিত। তাছাড়া সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত বা চূড়ান্তভাবে চাকরিচ্যুতের ব্যবস্থা গ্রহণসহ
আদালতের মাধ্যমে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি ক্রোক (Attachment) এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার নির্দেশ দেওয়া উচিত। এছাড়া বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং অর্জিত অবৈধ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করা এখন সময়ের দাবি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।








